বিশ্বসভ্যতার যত অগ্রগতি হচ্ছে, ততই একটা বিষয় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। সেটা হল মানবতাবাদ। মানবতাবাদ বা মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা নিয়ে এখনও বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এক একটা জাতিগোষ্ঠী নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ এবং মনুষ্যত্বকে সংজ্ঞায়িত করতে চায়।
মানুষ কে, মনুষ্যত্ব কি, মানবতা কি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি সংজ্ঞা তৈরির চেষ্টা অগ্রসর মানুষদের মধ্যে মধ্যযুগের আগে থেকেই ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক শক্তির অপপ্রভাবে তা নির্ধারণ করা সম্ভবপর হচ্ছিল না। অতঃপর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ তৈরি হবার পর একটি সর্বজনীন মানবতার সংজ্ঞা তৈরি করা হয়। এর প্রধান চেতনা হল কোন কিছুর বিনিময়ে মনুষ্যত্বকে ছোট করা যাবে না। মানবতাকে সবসময় প্রধানতম বিবেচ্যবিষয় বলে গ্রহণ করতে হবে। বিপরীতে ইসলামিক মানবতার সংজ্ঞা পড়ুন। নিজেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন।
অতীতে যেসব সামাজিক শক্তির প্রভাবে মানুষ মনুষ্যত্বের বিশ্বজনীন জয়গান গাইতে পারে নাই, তার মধ্যে ধর্ম প্রধানতম ছিল। ধর্মের কারণেই দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে মানুষ খণ্ডিত ছিল। মানুষের মন, বুদ্ধির যথাযথ বিকাশ ঘটতে পারে নাই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধর্মের কারণে পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি মানুষ মারা গেছে। ধর্ম এই গণহত্যাগুলোতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। নিজ বক্তব্য সমুন্নত রাখার জন্য ধর্মগুলো মানুষ হত্যাকে সমর্থন করেছে, উৎসাহ জুগিয়েছে।
বলা হয়ে থাকে ১৭৭০ সালের সমসাময়িক সময়ে জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের পরপর শুরু হয় আধুনিক বিজ্ঞানের যাত্রা। এর পরবর্তী ২০০ বৎসরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। মানুষ এমন সব সুবিধা বা জ্ঞান লাভ করেছে যা পূর্ববর্তী সহস্র বৎসরে ধর্মগুলো করে দেখাতে পারেনি। একটা সহজ উদাহরণ দেয়া যায়। ইসলাম ধর্মের প্রধান গ্রন্থ কোরানকে সকল জ্ঞানের আধার এবং প্রবর্তক মোহাম্মদকে সর্বকালের সেরা জ্ঞানী বলা হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই কোরানের কোথাও আরবভূমির মাটির নিচের তেলের খনির কথা লেখা নেই, কিংবা মোহাম্মদ তার পায়ের নিচ থেকে এক ফোঁটা তেল উত্তোলন করতে পারেন নি। তাকে রাতের অন্ধকারে উটের চর্বি জ্বালিয়ে চারপাশ আলোকিত করতে হয়েছে।
আজকে আমরা ধর্ম নয়, বিজ্ঞানের আশীর্বাদের কল্যাণে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদি পেয়েছি। রেফ্রিজারেটর, এসি. ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির কল্যাণে স্বস্তির জীবন যাপন করতে পারছি। বেচারা জ্ঞানী মোহাম্মদকে কিন্তু আরবের প্রচণ্ড গরমে শরীর পুড়িয়ে দিনযাপন করতে হয়েছে। এসির স্বপ্ন কোনদিন তিনি দেখেন নি। রাত্রে মরুভূমির তীব্র শীতে হিটার জ্বালাতে পারেননি। তিনি চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারেন (!?) কিন্তু একটা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে পারলেন না। তিনি দুলদুল ঘোড়ার পিঠে চড়ে সপ্ত আসমান ঘুরে আসতে পারেন, কিন্তু হেলিকপ্টার দূরে থাক, একটা বেলুনেও চড়ার কথা সাহাবীদের বলতে পারেন নি। ঘোড়ার পিঠে চড়েই তাকে বিভিন্ন যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে। এমনকি জ্বীনপরীদের পিঠে চড়ে যদি অনুসারীদের চোখের সামনে দু'একপাক ঘুরে আসতেন, তাও মানা যেত। জীপ দূরে থাক, মটরসাইকেল এমনকি একটা সাইকেলও তিনি উদ্বাবন করতে পারেন নি। নিজের বা বন্ধু-সাথীদের বিভিন্ন রোগে অসুখে তাকে টোটকা কবিরাজী চিকিৎসা নিতে হয়েছে। একটা সামান্য ট্যাবলেট খেতে পারেন নি। এভাবে ধর্ম ও ধর্মনেতাদের ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতার অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। সমকালীন পৃথিবীতে ধর্মগুলো মানুষের উপকার করতে সত্যিকার অর্থেই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, অথচ বাগাড়ম্বরে কোন ঘাটতি পড়তে দেখা যায় না।
আসলে যতদিন মানুষ অল্পশিক্ষিত থাকবে, যতদিন শাসকেরা মানুষের শিক্ষার সুযোগ সীমিত করে রাখবে, ততদিন ধর্ম তার অপশাসন চালিয়ে যাবে। ধর্মের উৎসাহে শাসকরা যা খুশি তাই করে যেতে পারবে। অনেকে বলে যে ধর্ম নয়, ধর্মকে যারা ব্যবহার করছে তারাই আসল দায়ী। কিন্তু তারা ভাবেনা যে ধর্ম নিজেকে ব্যবহার কেন করতে দেবে। ধর্ম কি এমন জিনিস যে তাকে অস্ত্রের মত করে ব্যবহার করা যায়। মানুষ মারার কাজে লাগসই অস্ত্র হিসেবে ধারণ করা যায়।
আমার আপত্তি ঠিক এই জায়গাটাতেই। অলৌকিকতা, আত্মা, পরকাল ইত্যাদি কোন সমস্যা নয়। এগুলো হাস্যকর, শিশুতোষ কৌতুক মাত্র। শৈশবে বুদ্ধির বিকাশের ও কল্পনার প্রসারের জন্য রূপকথার জগতের দরকার আছে। মানুষের সমাজবিকাশের শৈশবকালে এমন রূপকথার প্রয়োজন ছিল। তাছাড়াও তখন জ্ঞান সীমিত ছিল। একটা ডাইনোসরের হাড় পাওয়া গেলেও মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব ছিল না যে সেটা ডাইনোসর। তারা স্বাভাবিক বুদ্ধিতে বলবে যে, এটা কোন দৈত্য বা রাক্ষস-খোক্কসের হাড়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিকাশের সাথে সাথে আমরা বিভিন্ন অজানা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি। আরও যেগুলো পাইনি সেগুলো আগামী ২/১ শত বৎসরের মধ্যে পাওয়া যাবে। এই কথা বিশ্বাস করতে হবে না। বিজ্ঞান যে গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে তার সামর্থ্য ইতিমধ্যে কল্পনার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। আগামীতে আরও দূরে যাবে। আমাদের জীবনকে বিজ্ঞান আরও সহজ, সাবলীল, স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে।
ইতিহাসের কোন বাঁকে ধর্মগুলো কিন্তু মানুষের জীবনকে কখনও সামান্যতম রাঙিয়ে তুলতে পারেনি। পারেনি মানুষের জীবনকে সুখ ও শান্তিতে পরিপূর্ণ করতে। বরং মানুষকে ধর্মগুলো সবসময় ধমক দিয়েছে, চোখ রাঙিয়েছে। বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর ধূয়া তুলে মানুষকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
ইতিহাসের পাঠক মাত্রই ব্রিটিশ শাসনের শেষকালের দেশভাগের চরম বিপর্যয় সাম্প্রদায়িক গণহত্যার কথা জানেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব থেকে যে ট্রেন এসেছে, সে ট্রেনগুলো ছিল লাশ দিয়ে ভর্তি। মানুষকে কচুকাটা করে হত্যা করা হয়েছে। কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার কথা হয়ত অনেকে জানেন। গত শতকের শেষ দশকের ভারতের গুজরাট ও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা হয়ত অনেকের মগজ থেকে এখনও মুছে যায় নি। মধ্যযুগের কয়েকশত বৎসরব্যাপী চলা 'ক্রুসেড' এর কথাও অনেকে জানেন। এইসব মানবিক বিপর্যয় কার তৈরি? পাঞ্জাবের বুটা সিং এর অমর প্রেমকাহিনী কি মননশীল মানুষরা ভুলে যাবে। কখনও নয়। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন কার তৈরি? শাসকের নাকি ধর্মের? ধর্ম কি মানুষকে জাতিবিদ্বেষ শেখায় না? ধর্ম কি কাফের, মুশরিক, বিধর্মী ইত্যাদি অশ্লীল, নোংরা, কুৎসিত, জঘন্য শব্দ তৈরি করে নি?
এইসব বাস্তবতাই অগ্নিসেতু ব্লগের প্রয়োজনীয়তার পূর্বকথা। ধর্ম কি? তার স্বরূপ কি? বাস্তব কি? কল্পনা কি? আমরা কি মানুষ নাকি ধর্মীয় রোবট? মনষ্যত্ব কাকে বলে? মানুষ কে? মানবতার মানদণ্ড কিরূপ? ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে পরিষ্কার হবে। মানুষ বুঝতে পারবে মনুষ্যত্বের আসল সংজ্ঞা। ভালবাসবে পরস্পরকে। মানুষ জয়গান গাইবে মানবতার। ঘৃণাকে উপড়ে ফেলবে মগজ মনন থেকে।
আমরা যে অন্ধকারাচ্ছন্ন ধর্মপ্রভাবিত সমাজে বাস করছি, সেই থকথকে সমাজের ওপারে রয়েছে সবুজ, উষ্ণ, শান্ত, স্বস্তির এক আলোকিত সমাজ। সেই সমাজে যেতে হলে প্রয়োজন একটি সেতুর। অন্ধকারকে দূর করার জন্য প্রয়োজন আগুনের। পুড়ে অঙ্গার নয় পরিশোধন করার জন্যও প্রয়োজন আগুনের। ওপারের স্বপ্নীল সমাজে যেতে হলে অগ্নিসেতু'র বিকল্প নেই। সেই স্বপ্নসমাজে ভ্রমণ করার জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ভয় নেই, আগুনের আলোয় আলোকিত সেতু আমাদেরকে আগুনের স্পর্শে নিকষিত করবে। অগ্নিস্পর্শে আমাদের মগজ থেকে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে যাবতীয় অজ্ঞতা, কুসংস্কার, হিংসা ও বিদ্বেষের নোংরা প্রভাব।
আলোকিত সমাজের স্বপ্ন আপনাকে আলোকিত করুক। মনের গলিঘুপচি থেকে দূর হয়ে যাক যাবতীয় ধর্মীয় মলিনতা। আপনি মুক্ত হন যাবতীয় ধর্মীয় দাসত্ব থেকে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে ঘৃণা নয়, সম্মান করতে শিখুন। ভাল থাকুন। সত্যিকার শান্তিতে থাকুন।
-- অগ্নি অধিরূঢ়


0 comments:
Post a Comment